ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

swastik3অণুগল্প ৩৩ – ঠাকুর গড়া

বন্‌বন্‌ করে ঘুরছে নয়নের পটার্স হুইল । চূড়োর মত উঁচু তিগারে আলতো আঙুল বুলিয়ে নয়ন একের পর এক গড়ে চলেছে মাটীর ঐশ্বর্য্য । কখনো ফুলদানী, গাছের টব, কখনো কুঁজো, ঘট, জালা, সরা কখনো বা কলসী । মাটির বুকে সৃষ্টি হয়েই শিল্পকর্মের মাটির পায়ে আত্মসমর্পণ ।
নয়ন মনপ্রাণ এক করে সোনালী রোদের আঁচে সেঁকছে তার সৃষ্টিদের । তারপর সেগুলি পুড়বে আগুণের কড়া আঁচে। আর সবশেষে তার ওপরে নিপুণ হাতে রঙ বুলিয়ে একে একে ছবি ফুটিয়ে তোলার পালা । কালো মাটি, ধূসর মাটি, টেরাকোটা আর সবশেষে রঙ্গীন মাটি।
একবার  মাটির তালকে পুড়িয়ে ফেললে সে আর মাটি নয়। আর সে মিশতে পারবেনা মাটির বুকে লীন হয়ে।বদলে যাবে সেই মাটির রসায়ন।  

জমিদারবাড়ির বড়কর্তা এসে রূপোর আধুলি দিয়ে আশীর্বাদ করে তাঁর বসার ঘরের জন্য একজোড়া বিশাল টেরাকোটার ফুলদানী নিয়ে গেছেন নয়নের ওয়ার্কশপ থেকেই। বায়না করেছেন এবারের দুর্গামূর্তি। শুধু মুখ যেন ছাঁচে ফেলা না হয়। জমিদারবাড়ির দুর্গা পুজোতে কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা আসে প্রতিবছর। কিন্তু এবার কি মানে করে জমিদারবাবু পাড়ার এই নয়নের কাছ থেকেই মূর্তি নেবেন ভাবলেন।

নয়ন ভাবে এমন কাজের অর্ডার কোনোদিন একদিন পেতে পারে তা সে  স্বপ্নেও ভাবেনি। এবারের দুর্গাপুজোর মায়ের মূর্তি  গড়ার ভার পড়েছে নয়নের ওপরে । কিন্তু সে পারবে তো ?
ছোটখাটো লক্ষ্মী, বিশ্বকর্মা, সরস্বতী গড়েছে সে এযাবৎ তবে দুর্গা? কোনোদিনও সাহস করেনি বানাতে।

যথারীতি রথের দিনে একচালার বাঁশের কাঠামো রেডি করে শুরু হয়ে হয়েছে মায়ের মূর্তি গড়ার কাজ। শুধু মাথায় রাখতে হয়েছে জমিদারবাবুর হুঁশিয়ারি। মায়ের মুখটি কখনওই যেন ছাঁচে ফেলা না হয়।তাহলেই সব বারোয়ারি প্যান্ডেল মার্কা মুখ হয়ে যাবে…জমিদারবাবুর তা মোটেও পছন্দ নয়। তিনি বলেছেন ছাঁচে ঢালা আর হাতে গড়ায় অনেক তফাত।  

তিগার থেকে মায়ের মুখ আর বেরিয়ে আসেনা । নয়ন তাল তাল মাটি চড়ায় আর সাথে সাথে ভেঙ্গে ফ্যালে। মনের মত হয়না সে মুখ।
একটি মেয়ে এসেছে নয়নের কাছে মৃতশিল্প কিনতে । এইসময়েই যত খরিদ্দার আসতে হয়? আবার খরিদ্দারকে বউনির সময় ফেরানোটাও ঠিক নয়। খরিদ্দার হল লক্ষ্মী।  
  নয়ন বলছে, নিন না সস্তা করে দেব ব‌উনির সময়। মেয়েটি তার সুন্দর মুখশ্রী থেকে একফোঁটা নরম হাসি হেসে বলে , অনেক কিছুই লাগবে তো আমার। নেড়েচেড়ে দেখছে সে। পুজো আসছে না? ঘর সাজাতে হবে। কতকিছু লাগে এই সময় সংসারে। জিনিষ কেনার কি শেষ আছে ?  

আর নয়ন দেখছে মেয়েটির মুখ। বেশ অভিজাত ঘরের মেয়ে। তার আবার এত মাটির জিনিষের কি প্রয়োজন? যাক্‌ বাবা! অত ভেবে কাজ নেই। পয়সা দেবে জিনিষ নেবে। তবে মেয়েটি দোকানে পা দিতেই মায়ের মুখটা গড়াতে বেশ সুবিধেই হল নয়নের।   

দরদাম করতে করতে তিগারের কৃষ্ণমৃত্তিকা থেকে মায়ের মুখটি রূপ নিয়েছে নয়নের হাতে ।  একেবারে আচমকা।  সেই মুখ প্রাণ দিয়ে গড়ছে নয়ন। পানপাতার মত ঢলঢল মুখমণ্ডলে  টানাটানা বড় বড় চোখ। বাঁশীর মত টিকলো নাক, পাতলা একজোড়া বিম্বোষ্ঠ। এবার বাকী ত্রিনয়ন।  তারপর শুকনো করা।
ধীরে সুস্থে সে মেয়েও কিনছে কুমোরের পণ্য… একাটা ফুলদানী, দুটো সরা, তিনটে ফুলের টব আর অনর্গল কথা বলে চলেছে নয়নের সাথে… এটা আরও পোড় খেত কিম্বা এটা একটু ফাটা আছে…এইসব আর কি !
কিছুপরে  আবার সেই  খুঁতখুঁতে মেয়ে বলে… না, না বড্ড দাম চাইছ তুমি, আরেকটুঁ কমাও। এতগুলো জিনিষ নিচ্ছি যখন…।
কিন্তু মায়ের মাটির কপালে ত্রিনয়নটি যেন হয়েও হচ্ছেনা মনের মতন। নয়ন ভাবে এবার মেয়েটি দোকান থেকে দাম মিটিয়ে চলে গেলে আর সে গড়বে কি করে? অবিশ্যি মেয়ের তো আর কপালে ত্রিনয়ন নেই, সে তো কেবল রক্তমাংসের কন্যাশ্রী।
মেয়েটা বলে, ও কুমোর ভাই? আমার যে দেরী হয়। এবার তোমার জিনিষ দাও আর দাম নাও। নয়ন বলে আরেকটু দেখনা দিদিমণি। তোমার আরও যদি কিছু পছন্দ হয় আমার মাটির সম্ভার থেকে।
বলেই নয়ন তাকায় মেয়েটির কপালে। এ কি! মেয়েটির কপালে যে বিশাল একটা পাতার মত কালো টিপ? নীচে ছোট্ট বিন্দুর মত একফোঁটা লাল …বেশ মানিয়েছে তাকে। এতক্ষণ খেয়াল করেনি সে।

মায়ের মুখশ্রী মনের মত হল বটে এতক্ষণে! পাশেই রাখা জলে হাতদুটো ধুয়ে, শুকনো কাপড়ে মুছে এবার  ঐ মেয়েটির দাম মিটিয়ে তার জিনিষগুলো ভাল করে কাগজে মুড়ে দেবার পালা। তারপর রঙ তুলি দিয়ে নিঁখুত পঞ্চইন্দ্রিয়…  ঘামতেল মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ী শ্রীমতি ।
কিন্তু সেই মেয়ে গেল কোথায়? জিনিষগুলো বেছে রেখেছে তো দেখছি এখানেই, দোকানের সামনে..অনেকদিন পর  বেশ ভাল খদ্দের এসেছিল দোকানে। অনেক কিছু নেবে বলেছিল। বউনি হত আজকের মত। নয়ন কেন যে হাতের কাজ ফেলে রেখে দামদর মেটালোনা!
তবে তার চেয়েও অনেক বেশী পেয়েছে সে আজ। সাক্ষাত মাদুর্গার মুখখানি পরম আনন্দে গড়তে পেরেছে আজ সে।

Advertisements
This entry was posted in Uncategorized. Bookmark the permalink.

10 Responses to ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

  1. Srabani Dasgupts বলেছেন:

    সুন্দর। পুজো পুজো সুবাস।
    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

  2. শাশ্বতী সরকার বলেছেন:

    কি সুন্দর করে যে মৃণ্ময়ীর সাথে চিন্ময়ীকে মিলিয়ে দিলে ! অপূর্ব লিখেছ ইন্দিরাদি।

  3. পিয়ালী গাঙ্গুলি বলেছেন:

    খুব সুন্দর হয়েছে ইন্দিরা দি

  4. পিয়ালী গাঙ্গুলি বলেছেন:

    খুব সুন্দর হয়েছে।

  5. drsonalibmukherjee বলেছেন:

    তোমার পরশ আসে,কখন, কে জানে।
    বিভুতি মুখো কে মনে পড়ে গেল।

  6. anindita mandal বলেছেন:

    চিন্ময়ী মৃন্ময়ী হয়ে আসছেন, তার আগাম অভ্যর্থনা ।

  7. শর্মিলা দাশগুপ্ত বলেছেন:

    খুব ভালো লাগল।মন ভরে গেল।

  8. Swagata tintin banerjee বলেছেন:

    What a wonderful piece of writing you have presented prior to the Puja.!
    Happy Pujo to you all!

  9. Gargi বলেছেন:

    Pujor golpo, pujo pujo gondho.. Khub bhalo laglo😊

  10. অজ্ঞাত বলেছেন:

    deri holo site-e aste… kintu ami ekhon mantromughdho…

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s